Tag

health

Browsing

ইউরিন ইনফেকশন যে শুধু বড়দের হয় ব্যাপারটা কিন্তু তা না। বড়দের মতোই বিভিন্ন কারণে শিশুর ইউরিন ইনফেকশন দেখা দিতে পারে মূত্রতন্ত্রের কোনো অংশে জীবাণুর সংক্ৰমণ হলে সেটিকে ইউরিন ইনফেকশন বা প্রস্রাবের সংক্ৰমণ বা UTI বলে। মেয়ে শিশুদের এটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি কিন্তু ছেলে শিশুদেরও এই সমস্যা হতে পারে।

মেয়ে শিশুদের মধ্যে এই রোগের সংক্ৰমণ হওয়ার প্রবণতা বেশি কারণ মেয়েদের মূত্রনালী ছেলেদের মূত্রনালীর তুলনায় দৈর্ঘ্যে অনেক ছোট। এছাড়া মেয়েদের মূত্রনালী পায়ুপথের খুব কাছাকাছি অবস্থিত, ফলে ব্যাকটেরিয়া পায়ুপথ থেকে মূত্রনালীতে খুব সহজে প্রবেশ করে প্রস্রাবের সংক্ৰমণ ঘটায়।

শিশুর ইউরিন ইনফেকশনের লক্ষণ

১ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের ইউরিন ইনফেকশন হলে সাধারণত শিশু অকারণে বিরক্তি প্রকাশ করে, খেতে চায় না। শিশুর জ্বর থাকতে পারে, কখনো কখনো ডায়রিয়া দেখা দেয়। প্রস্রাবে দুর্গন্ধ, গাঢ় প্রস্রাব হওয়া, প্রস্রাব কমে যাওয়া বা একেবারেই না হওয়া এ ধরনের লক্ষণও দেখা যায়।

১ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ইউরিন ইনফেকশন হলে যে লক্ষণ গুলো দেখা দেয় তা হলঃ

  • জ্বর
  • ঘন ঘন প্রস্রাব
  • প্রস্রাবের সময় জ্বালাপোড়া
  • বিছানায় প্রস্রাব করা
  • তলপেটে ব্যথা
  • কখনো কখনো প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত যাওয়া
  • কিডনির স্থানে ব্যথা

প্রস্রাব গাঢ় হলুদ বা লালচে হওয়া, প্রস্রাবে দুর্গন্ধ, ঠিকমতো প্রস্রাব না হওয়া, কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসা- এই উপসর্গ গুলোও থাকতে পারে।

শিশুদের ঘন ঘন ইউরিন ইনফেকশন কেন হয়?

১. মলত্যাগের পর ধৌত করার সময় এসব ব্যাকটেরিয়া প্রস্রাবের দ্বার দিয়ে মূত্রনালি পথে ভেতরে প্রবেশ করলে।

২. এছাড়া মূত্রপথে কোনো আবদ্ধতা(obstruction)থাকলে।

৩.কোষ্ঠকাঠিন্য।

৪. কিছু বাচ্চার মধ্যে জন্ম থেকেই ভেসিকোইউরেটেরাল রিফ্লাক্স বলে এক ধরনের সমস্যা দেখা যায়। তাদের বেশি হয়।

৫. নার্ভাস সিস্টেমের অসুখ থাকলে ব্লাডার পুরোপুরি খালি হতে পারে না।

৬. বাচ্চার যদি টয়লেটে যেতে অনীহা থাকে।

ইউরিন ইনফেকশনের চিকিৎসা

শিশুর ইউরিন ইনফেকশনের লক্ষণ দেখা দিলে সেগুলো উপেক্ষা না করে একজন ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে। প্রয়োজনবোধে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক সেবন করতে হবে। অ্যান্টিবায়োটিকের সম্পূর্ণ কোর্স শেষ করা গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষণগুলো কমে আসতে শুরু করলেও প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ঔষধের কোর্স সম্পন্ন করতে হবে। সাধারণত ঔষধ খাওয়া শুরু করার দুই-তিন দিনের মধ্যে লক্ষণগুলো কমতে শুরু করে। যদি ঔষধের কোর্স সম্পন্ন করার পরেও লক্ষণের উন্নতি না হয় তাহলে দ্রুত ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

শিশুর ইউরিন ইনফেকশন প্রতিরোধ

কিছু নিয়ম মেনে চললে ইনফেকশন হওয়ার প্রবণতা কমিয়ে আনা যায়। যেমনঃ মেয়ে বাচ্চাদের টয়লেটে টিস্যু ব্যবহারের সময়ে সামনে থেকে পেছনে পরিষ্কার করুন। শিশুর যৌনাঙ্গ শুকনো ও পরিষ্কার রাখুন। তাকে প্রচুর পানি পান করান। বাথটাব বা পুকুরে গোসল করার পরিবর্তে শাওয়ার কিংবা বালতির সাহায্যে গোসল করান।প্রস্রাব করার সময় শিশু যেন তাড়াহুড়া না করে সেদিকে খেয়াল করুন।

প্রস্রাবের বেগ আসলে তা ধরে রাখবে না এটা বাচ্চাদের শিখাতে হবে। টাইট প্যান্ট পরাবেন না। ইউরিন ইনফেকশন উপেক্ষা করলে সেটি খুব সহজেই গুরুতর রূপ ধারণ করতে পারে। তাই লক্ষণগুলোর ব্যাপারে সচেতন থাকা উচিত ও ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উচিত।

ডায়াবেটিস বলতে আমরা বুঝি রক্তে গ্লুকোজের আধিক্য। গর্ভকালীন সময়ে মায়ের রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি হলে তাকে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস (Gestational Diabetes Mellitus/GDM) বলা হয়ে থাকে। সাধারণত প্রেগনেন্সিতে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে শরীরে ইন্সুলিন ঠিকভাবে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়। গর্ভকালীন ডায়াবেটিস সাধারণত সন্তান জন্মদানের পরই সেরে যায়। তবে কারো কারো ক্ষেত্রে পরবর্তীতে টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং কোনও কোনও ক্ষেত্রে গর্ভের শিশুও ডায়াবেটিস আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে। তাই এসময় সঠিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ভীষণ জরুরি।

একজন নারী মা হওয়ার সময় অনেক রকমের জটিলতার মধ্য দিয়ে যায়। তবে এসময়ে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস বা GDM হলে পুরো প্রেগনেন্সিতে একটু বেশিই সচেতন থাকতে হয়। পাশাপাশি লাইফস্টাইল মডিফিকেশন ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনও এক্ষেত্রে একান্ত আবশ্যক।

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস এর কিছু কমন লক্ষণ

(১) বারবার প্রস্রাবের প্রয়োজন হওয়া, বিশেষ করে রাতে

(২) ঘন ঘন ইউরিন ইনফেকশন দেখা দেওয়া

(৩) অতিরিক্ত পিপাসা পাওয়া

(৪) অতিরিক্ত ক্লান্তিবোধ হওয়া

(৫) বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া

(৬) ক্ষুধা বেড়ে যাওয়া

কোনও কোনও ক্ষেত্রে মায়ের ওজন কমে যেতে পারে। তবে গর্ভাবস্থায় অন্য অনেক কারণেই ওজন কমতে পারে তাই ওজন কমে গেলেই ডায়াবেটিস হয়েছে এমন ভাবা যাবে না। আমাদের মনে রাখতে হবে সবার ক্ষেত্রে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিসের লক্ষণ এক নাও থাকতে পারে, কাজেই উপরের লক্ষণগুলো থাকলেই GDM হয়েছে এমনটা ধরে নেওয়া যাবে না। সঠিক ডায়াগনোসিসের মাধ্যমেই জানা যাবে যে সত্যিই GDM হয়েছে কিনা।

প্রেগনেন্সিতে ডায়াবেটিস পরীক্ষা করার পদ্ধতি 

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস নির্ণয়ের জন্য সাধারণত Oral Glucose Tolerance Test করা হয়। গর্ভাবস্থায় ২৪-২৮ সপ্তাহে এই পরীক্ষা করা হলেও যেসব মায়েরা উচ্চ ঝুঁকিতে থাকেন তাদের ক্ষেত্রে এই পরীক্ষাটি আগে করা হয়।

এক্ষেত্রে খালি পেটে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা ৬.১ মিলিমোল/লিটার (১১০মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) বা তার চেয়ে বেশি অথবা ৭৫ গ্রাম গ্লুকোজ খাওয়ার ২ ঘণ্টা পরে ৭.৮ মিলিমোল/লিটার (১৪০ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার) বা তার চেয়ে বেশি হলে তাকে GDM ধরা হয়।

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস (GDM) হলে খাদ্যাভ্যাস যেমন হওয়া উচিত

গর্ভাবস্থায় সকলেরই সঠিক পরিমাণে সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত। গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হলে রোগীকে অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট খাদ্য তালিকা মেনে চলতে হবে।

১) যতটা সম্ভব পুষ্টিকর ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খেতে হবে, মুখে যা ভালো লাগবে তাই অনেক পরিমাণে খেয়ে ফেলবো এমনটা একদম করা যাবে না।

২) এ সময়ের খাদ্য তালিকা এমন হওয়া উচিত যাতে সঠিক পরিমাণে আমিষ, চর্বি, শর্করা এবং সব ধরনের প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ আর ভিটামিনের চাহিদা পূরণ হবে।

৩) গ্লুকোজ লেভেলকে ঠিক রাখতে সময় মেনে খাবার খেতে হবে। সকালের নাস্তা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে এবং কোনো বেলার খাবার স্কিপ করা যাবে না, অল্প অল্প করে বারবার খেতে হবে।

৪) অতিরিক্ত ফ্যাট জাতীয় খাবার, ফাস্টফুড, ডুবো তেলে ভাজা খাবার, রিচ ফুড খাওয়া অবশ্যই পরিহার করতে হবে।

৫) নির্দিষ্ট পরিমাণে ফল ও সবজি খাদ্য তালিকায় যোগ করুন, প্রতিবেলার খাবারের সঙ্গে সালাদ রাখার চেষ্টা করুন।

৬) সরাসরি চিনি বা অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খাদ্যতালিকায় রাখবেন না। চর্বি ছাড়া মাছ, ডিম, মুরগির বুকের মাংস খেতে পারেন। লাল মাংস এড়িয়ে চলুন।

৭) নিয়মিত লো-ফ্যাট দুধ ও টক দই খেতে পারেন। খাবারে তেলের ব্যবহার কমাতে হবে, সম্ভব হলে রাইস ব্র্যান, সানফ্লাওয়ার বা অলিভ অয়েল ব্যবহার করুন।

৮) সাদা চিনি ও সাদা আটা ডায়েটে না রেখে পরিমিত পরিমাণে খেজুর, লাল আটা, ওটস খাদ্য তালিকায় যোগ করুন।

৯) সুগার ক্রেভিং হলে বিস্কুট, কেক, চকলেট, আইসক্রিম এর পরিবর্তে মিষ্টি ফল খেতে পারেন।

১০) চেষ্টা করতে হবে প্রতিদিন একই সময়ে খাবার খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। একসাথে অনেক খাবার না খেয়ে খাবারগুলো ছোট ছোট ভাগে ভাগ করে নিতে হবে, ক্যালরি ঠিক রেখে ৩ বেলা প্রধান খাবার, ১/২ বেলা হালকা নাস্তা খেতে হবে।

১১) সকালের খাবারে লো গ্লাইসেমিক খাবারগুলো রাখতে হবে। যেকোনো বেলার খাবারে অর্ধেক শাক-সবজি, বাকি অর্ধেক প্রোটিন ও কার্বোহাইড্রেট রাখবেন। প্রতিদিন ২ থেকে ৩ লিটার পানি পান করার চেষ্টা করবেন।

লাইফস্টাইলে যেমন পরিবর্তন জরুরি

জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস (GDM) হলে লাইফস্টাইলেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা প্রয়োজন, যেন গ্লুকোজ লেভেল নিয়ন্ত্রণে থাকে এবং মা ও শিশু দুজনেই থাকে সুস্থ।

প্রতিবেলা খাবার খাওয়ার কিছুক্ষণ পরে ৫-১০ মিনিট হালকা হাঁটাহাঁটি করার চেষ্টা করুন। যদি অন্য কোনও কমপ্লিকেশন না থাকে তাহলে কিন্তু প্রেগনেন্সিতেও হালকা ধরনের ব্যায়াম, হাঁটা চলা, কিছু যোগব্যায়াম করা যায়। প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিটের ব্যায়াম রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। তবে অবশ্যই ডাক্তারের সাথে আলোচনা করে তারপর ব্যায়াম করুন।

অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধি GDM এর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। এতে গর্ভের শিশুরও ভবিষ্যতে অতিরিক্ত ওজন বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস হওয়ার ঝুঁকি থাকে। মায়ের হৃদরোগের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পায়। তাই ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

স্ট্রেস ম্যানেজমেন্টের দিকে মনোযোগী হতে হবে। অতিরিক্ত মানসিক ছাপ GDM নিয়ন্ত্রণে সমস্যা তৈরি করে। তাই মনের স্বাস্থ্য ভালো রাখতে হবে। মেডিটেশন এক্ষেত্রে উপকারী ভূমিকা পালন করে। প্রতিদিন পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে হবে। ঘুমের ঘাটতি হলে ইন্সুলিনের কার্যক্ষমতা হ্রাস পেতে পারে যা GDM এর ক্ষেত্রে আরও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

শেষকথা

GDM বা গর্ভকালীন ডায়াবেটিস দেখা দিলে অবশ্যই একজন গাইনী ডক্টর এর পরামর্শে থেকে নিজের ও গর্ভের শিশুর অবস্থা পরীক্ষা করানো উচিত। এছাড়া পুষ্টিবিদের পরামর্শমতো গর্ভাবস্থার পুরো সময় জুড়ে সঠিক নিয়ম ও ক্যালরি মেনে খাবার খেতে হবে। অর্থাৎ সঠিক খাদ্যতালিকা অনুসরণ করা একান্ত আবশ্যক। গর্ভাবস্থায় নিয়মিতভাবে ফিজিক্যাল কন্ডিশন বুঝে হাঁটাহাটি বা হালকা ব্যায়াম করতে হবে, তবে অবশ্যই আপনার ডক্টর, এক্সপার্ট ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ অনুযায়ী। কোনো অবস্থাতেই এক্সপার্ট এর পরামর্শ ছাড়া ভারি কোনও ব্যায়াম যাবে না।

সঠিকভাবে নিয়ম মেনে খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রা নিয়ন্ত্রণ করলে জেস্টেশনাল ডায়াবেটিস হলেও মা ও শিশুর সুস্থতা নিশ্চিত করা সম্ভব। আজ এ পর্যন্তই। সবাই ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।